একটি অপরিকল্পিত Roadtrip....
আচ্ছা....বলুন তো...মুখোশ টা খুলে বুক ভোরে নিঃশ্বাস নেন নি কতদিন ?? সত্যি বলছি নিজের professional obligation এর কারণে মুখোশ টা প্রায় খোলাই হয় না আমার বাড়ির বাইরে | খোলা উচিতও নয় |
প্রাণ খুলে বেড়াতে যাওয়া হয় নি অনেকদিন হলো, আক্ষেপ থাকলেও নিয়ম ভেঙে ভিড়ের মধ্যে বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না কখনোই | ভিড় থেকে দূরে সবুজের মধ্যে কিছুক্ষন মুখোশ খুলে নিঃশ্বাস নেওয়ার চিন্তা টাকে তাই দূরে সরিয়ে রাখতে পারি নি| Sanitiser, কিছু শুকনো খাবার নিয়ে দুই বন্ধু মিলে বাইক নিয়ে এক রবিবার খুব ভোরে বেরিয়ে পড়লাম | বাইক টাও যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো ! বিগত 3-4 দিন নিম্নচাপ জনিত অঝোরে বৃষ্টিও রাত থেকে বিরাম নিয়েছে | প্রসন্ন বরুণদেব কে প্রণাম সেরে বেরিয়ে পড়লাম|
যাবো ঝাড়গ্রাম হয়ে বেলপাহাড়ি | তারপর কিছু ঠিক নেই, ফিরে আসবো অবশ্যি সন্ধ্যের মধ্যেই | এই অতিমারীর সময় বাইরে কোথাও থাকা বা খাওয়া নৈব নৈব চ | আমার শ্রীমতি আলো ফুটতে না ফুটতেই টোস্ট, ডিমসেদ্ধ আর কলা সহযোগে ব্রেকফাস্ট টিফিনবক্স বন্দি করে ফেলেছে ততক্ষনে | আজকের ছোট্ট আউটিং এ যেতে পারবে না, তাই রাগ হলেও ব্রেকফাস্ট টা ভালোবেসেই বানিয়েছিলো অবশ্য |
ভোর 5.30টাই বাইক দুটোর ইঞ্জিন গরম হতেই রওনা দিলাম, এক ঘন্টায় খড়গপুর ক্রস করে গেছি কোলাঘাট থেকে | কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে মোবাইল এ GPS সেট করে নিলাম | লোধাশুলি তে ঠিক করলাম ঝাড়গ্রাম হয়েই বেলপাহাড়ি যাবো,ঝাড়গ্রাম শহরটাকে বাইপাস করে নিয়ে চিল্কিগড় হয়ে যাওয়ার রাস্তাটাকে বেছে নিয়েছি | রাস্তায় চিল্কিগড় রাজবাড়িতে দাঁড়িয়ে কিছু ছবি তুললাম, দেখলাম কনক-দূর্গা মন্দির অতিমারীতে দর্শনার্থীদের কাছে ব্রাত্য | বেলপাহাড়িতে পৌঁছলাম, তখন বাজে প্রায় সকাল 9টা |
পৌঁছে গেলাম 'খেঁদারানি' জলাধার, কেউ কেউ তাকে খান্দারানী বা খন্দরানী বলেও ডাকে | শেষ 10 কিমি মেঠো রাস্তা কয়েকদিনের বৃষ্টিতে বেশ পিচ্ছিল হয়ে আছে কিছু জায়গায় | এই জলাধারে আমরা ছাড়া কোনো বহিরাগত নেই, শুনেছি শীতকালে বেশ ভিড় হয় এখানে,সেইসময় দেখার সুযোগ মেলে কিছু পরিযায়ী পাখিদের | আপাতত ভীড়হীন পরিবেশটাই স্বস্তিভরে বেশ উপভোগ করলাম 2ঘন্টার মতো | লেক এর ধারেই একটা অস্থায়ী পাটাতনের উপর বসে ব্রেকফাস্ট টাও সেরে নিলাম | নলকূপ এর ঠান্ডা জল এ চোখ মুখ ধুয়ে আর তৃষ্ণা মিটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম পরের গন্তব্যে |
গুগুল মানচিত্র অনুসরণ করে পোঁছলাম ' গার্ডাসিনী' বা 'গারড়াসিনী' পাহাড়| হিলটপ এ যেতে পারলাম না অবশ্য, রাস্তা বন্ধ আছে এখন | কিন্তু ছোট ছোট পাহাড় বা টিলা সহযোগে যে সবুজঘন পরিবেশ পেলাম তা অবর্ণনীয়, বর্ষার জল পেয়ে সে যেনো আরও সবুজ আরও সতেজ হয়ে উঠেছে | দূরে পাহাড়, অনতিদূরে সবুজ ধানের জমি, সেখানে আদিবাসী মহিলারা সামনে ঝুকে ধানের চারা রোপন করছে |আমাদের ছবি তুলতে দেখে বেশ অবাক ই হচ্ছে বৈকি | ইস্কুল এখনো বন্ধ, কচিকাচারা রাস্তার ধারে কিংবা বনের মাঝে নিজেদের খেলায় মত্ত, হঠাৎ আমাদের দেখে ছুটে এসে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানাচ্ছে | ঠিক ছোটবেলা আমরাও যেমন উড়োজাহাজ এর 'গঁ গঁ' শব্দ শুনে বাড়ির বাইরে বা ছাদে একছুট্টে বেরিয়ে পড়তাম, ঠিক তেমনি ওদের নিষ্পাপ অনুভূতিটা বুঝতে পেরে মনে মনে যেনো হেসে উঠলাম | কি সুন্দর ই না ছিল ফেলে আসা শৈশব ?
ঠিক ছিল হাতে সময় থাকলে 'ঝিলিমিলি' র দিকে একটু ঢুঁ মেরে আসবো, ওখানে 'তালবেড়িয়া' ড্যাম টা দেখার ইচ্ছে আছে | আরও 30-40কিমি গেলেই মুকুটমণিপুর | ওদিকটা আগে গিয়েছি | রাস্তায় আমাদের দেখে কিছু পুলিশ আমাদের ইতিবৃত্ত জানতে চাইলো,যা হয় আরকি | 'কোথা থেকে আসছেন?', ' কোথায় যাবেন?', 'কি বাইক এটা?' ইত্যাদি | "আপনারা এতদূর এসেছেন যখন শিমুলপাল ঘুরে দেখতে পারেন,ভালো লাগবে" একজন মধ্যবয়স্ক পুলিশ মশাই আওড়ে দিলেন | 'শিমুলপাল' জায়গাটা আমাদের পরিকল্পনাতে ছিলো না, কিন্তু বাইক নিয়ে যখন এসেছি আর বাইকে যখন তেল আছে তখন ভয় কিসের ? বেলপাহাড়ি থেকে ঘাটশিলা যাওয়ার রাস্তা থেকে একটা জায়গায় বামদিকে বেঁকে শিমুলপাল যেতে হয় |
খুব ভালো রাস্তা নয়, কিন্তু সেই রাস্তার আঁকেবাঁকে যে রহস্য, যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, Landscape এর যে পালাবদল, সেটা উপভোগ করা বোধহয় Roadtrip এই সম্ভব | ছড়ানো ছেটানো কিছু দেহাতি গ্রাম, কখনো চড়াই, কখনো উৎরাই, হঠাৎ করে বাইকের সামনে চলে আসা হাঁস-মুরগি, গরু-মহিষের পাল ঠেলে এগিয়ে চলা...ঐ 30কিলোমিটার রাস্তা যেনো স্বপ্নের ঘোরে বয়ে চলেছি | যখনি সুযোগ পেয়েছি,ক্যামেরা বের করে মনের সুখে ছবি ও তুলেছি | 'রাঢ়বঙ্গ' এর প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল explore করার এতো ভালো সুযোগ আগে আসে নি|
যে রাস্তা ধরে চলেছি, গুগল মানচিত্রে ও তাকে 'Unknown road' বলে উল্লেখ করছে | গ্রাম গুলো পেরিয়ে ঘন জঙ্গল ঘেরা পাহাড়াঞ্চল দিয়ে যখন এগিয়ে চলেছি, গা ছমছম করেনি বললে মিথ্যে বলা হবে | উল্টোদিক থেকে একটা 'Antimine Vehicle' দেখে যেনো সেই ভয় আরও কয়েকগুন বেড়ে যায় | শিমুলপাল থেকে আমরা একটা অজানা শর্টকাট রাস্তা নিয়েছিলাম যেটা ঝাড়খণ্ড হয়ে 'ধলভূমগড়' এ গিয়ে হাইরোড এ ওঠে| ঝাড়খন্ড এ প্রবেশ করামাত্র মাখন-মসৃন রাস্তায় পড়লাম | গ্রামাঞ্চলের আপাত-গুরুত্বহীন রাস্তাও যে এত সুন্দর এবং গোছানো হয়, এখানে না এলে জানতাম না | না আমাদের আর দাঁড়াতে হয়নি, ঐ রাস্তায় দাঁড়ানো যায় না, ঐ রাস্তাকে শুধু উপভোগ করতে হয় | একটা জায়গায় রাস্তা বলতে প্রায় 1 কিলোমিটার লম্বা, বেশ চওড়া একটা কংক্রিট এর চাতাল..ওটা 'Dhalbhumgar Airodrome' ব্রিটিশ আমলের পরিত্যক্ত এয়ারফোর্স এর রানওয়ে | ওর ওপর দিয়েই রাস্তা করে দেওয়া আছে |
ধলভূমগর এ যখন হাইওয়ে তে পড়লাম তখন বাজে বেলা 2টো | এবার ফেরার পালা | ওখান থেকে কোলাঘাট 167কিমি | আর ফিরে তাকাইনি| এই অনির্বচনীয় দুঃসময় ও মহামারীর মধ্যে, একবেলার দূষণমুক্ত অক্সিজেন ভরপুর অভিজ্ঞতা বুকে ভোরে,না আর ফিরে তাকাইনি | আড়াই ঘন্টায় বাকি রাস্তা একনিঃশ্বাসে শেষ করে যখন বাড়ি পৌঁছাই, তখন সবে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে | 'বরুণদেব' কে আবার একবার নমস্কার ঠুকে যাত্রা সাঙ্গ করলাম |
®Subhajit Bhakta.














Shimulpal r rasta ta sottyi khb sundor.tourist spot to??night stay r ki option a6e??
ReplyDeleteThank you for your comment. Simulpal ...akta sightscene hote pare...thakar jaiga nei bolei jani.apni jodi offbeat homestay khojen...prakriti r moddhe...tobe Gardasini te akta homestay ache. Google Map e naam o location o deoa achr
Delete