অনেকেই আমাদের জিজ্ঞেস করে 'তোরা বছর বছর সিকিম যাস, সিকিম এ কি এত পাস?'। তাদের কি করে বলি, সিকিম শুধু পাহাড় আর ঝর্ণা নয়, সিকিম একটা অভিজ্ঞতা, যে অভিজ্ঞতার ডায়ারি তে নতুন নতুন পাতা ভরাতে বেশ লাগে, নতুন নতুন কোণ থেকে দেখা কাঞ্চনজঙ্ঘা র ছবিতে তুলি দিতে ক্লান্তি আসে না । আমার কাছে গ্যাংটক, পেলিং, রাভাঙলা র বাইরেও একটা বিশাল সম্ভাবনার নাম সিকিম । তাই এবারের ভ্রমণ ঠিকানা নর্থসিকিমের নির্জন ভ্যালি - জঙ্গু।
নভেম্বর মাস, এই সময় সিকিম এর বেশ কিছু জায়গা সেজে ওঠে 'চেরি ব্লসম' এর চোখ জোড়ানো 'বেবি পিঙ্ক ' রঙে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য 'টেমি টি গার্ডেন ' চত্বর। এখানে একরাত কাটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম নর্থসিকিম এর দিকে। টেমি থেকে 'সিংতাম' হয়ে 'মঙ্গন' এর রাস্তা ধরতে হয়। ওই রাস্তা ধরে যতই এগিয়ে গেছি, ততই নিজেদের অসহায় বলে মনে হয়েছে। কোথাও দুমড়ে যাওয়া আস্ত ব্রিজ, কোথাও উপড়ে আশা গাছপালা, একমাস পরেও প্রকৃতি ও তিস্তার মহাকাল রূপ দেখে শিহরিত হই। জায়গায় জায়গায় রাস্তা সারানো, ব্রিজ সারানোর কাজ চলার জন্যে জঙ্গু ভ্যালি পৌঁছতে বেশ সন্ধ্যে হয়ে আসে। মঙ্গন থেকে পার্মিট আমাদের আগেই করানো ছিল। এই মঙ্গন থেকেই পশ্চিম দিকে জঙ্গুর রাস্তা বেঁকে যায়। আমাদের গন্তব্য 'লিঙ্গতেম' গ্রাম। 'লিঙ্গতেম লিয়াঙ্গ হোমস্টে '।জঙ্গু ভ্যালি প্রবেশ করতেই লক্ষণীয় হবে এখানকার পাহাড়গুলোর আকৃতির পরিবর্তন, যা বাকি সিকিমের থেকে আলাদা। বেশি খাড়াই, 'টাওয়ার' আকৃতির। আর অবশ্যই আলাদা করে ধরা পড়বে এখানকার নির্জনতা, একাকিত্ব,নিস্তব্ধতা। ঝিঁ ঝিঁ'র অবিরাম ডাক যে নিস্তব্ধতার পরিপূরক। সহজ সরল 'লেপচা' উপজাতিদের আদি বাসস্থান এই ভ্যালি।
আদি অনন্ত কাল ধরে লেপচারা এখানে প্রকৃতির সাথে সহাবস্থান করছে। পৃথিবীর অন্যতম শান্তিপ্রিয় ও সুখী জনজাতির তালিকায় এরা স্থান পায়। প্রকৃতির নিয়মে বিলুপ্তপ্রায় এই জাতির 'সর্বশেষ দুর্গ 'বলা চলে এই জঙ্গু ভ্যালি। সেই দুর্গের মধ্যে সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নিজেদের প্রাচীন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখার এক কালজয়ী সংগ্রাম করে চলেছে এরা হাসিমুখে। লিঙ্গতেম গ্রামে কমতে কমতে সর্বসাকুল্লে এখন ৪২ টি পরিবারের বাস। ধান, মিলেট, বিভিন্ন সবজি, ফল, প্রধানত কৃষিকাজ এদের মুখ্য জীবিকা। আধুনিক ট্যুরিজম এর উগ্রতা এদের মাথায় চড়ে বসে নি, তাই এদের আতিথেয়তা এখনো অনাড়ম্বর কিন্তু আন্তরিক। সন্ধ্যের অন্ধকারে পাহাড়ের কোলে এদের সাথে আড্ডা, নাচ এক অনন্য অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। এদের কাছে জানতে পারি, এরা প্রকৃতির উপাসক, কাঞ্চনজঙ্ঘা এদের সর্বময় পরিত্রাতা, অভিভাবক। এরা পুনর্জন্ম তে বিশ্বাসী আর মানবজন্ম এদের কাছে আশীর্বাদ।
যারা কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে মুগ্ধ হন প্রতিবার, তাদের কাছে স্বর্গসম এই জায়গাটি। এত কাছ থেকে তাঁর এত বিস্তার খুব কম জায়গা থেকেই ধরা পড়ে। লিঙ্গতেম থেকে 'টিংবং' হয়ে 'পেংটং' যাওয়ার পর আর রাস্তা নেই, শুরু হয়ে যায় 'কাঞ্চনজঙ্ঘা ন্যাশনাল কনসরভেশন এরিয়া ', এখানে থেকে শুরু হয় বিভিন্ন ট্রেক রুট।পরেরদিন খুব ভোরে পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে সূর্যোদয় এর সাথে সাথে পশ্চিমের দিগন্তে কাঞ্চনজঙ্ঘার মুকুটে স্বর্ণাভ প্রতিবিম্ব আমাদের মুগ্ধ করে। বেলা বেড়ে চলে, মিলেট এর রোল সহযোগে ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়ি জায়গাটাকে আরও নিবিড় ভাবে জানার ইচ্ছায়। মিলেট বলতে মনে পড়লো, গতকাল রাতেই পরিচয় হয়েছে বিখ্যাত 'ছাঙ্গ' এর সাথে। মিলেট থেকে তৈরি একপ্রকার সাবেকি স্থানীয় 'বিয়ার'। ইসৎ মিষ্টি, ইসৎ অম্ল এই পানীয় পরিবেশন করা হয় সুদৃশ্য নলাকার বাঁশের পাত্রে আর খেতে হয় বিশেষ বাঁশের স্ট্র দিয়ে।
জঙ্গু ভ্যালির বুক চিরে বয়ে যায় নীলকান্তমণি 'রংইয়ং নদী '।২০১৬ সালে এখানে এক ভয়াবহ 'ল্যান্ডস্লাইড' হয়। প্রকৃতির নিয়মে জন্ম নেয় কিছু 'হট স্প্রিং'। সেই ভূমিধস নদীর গতপথ আটকে জন্ম দেয় 'মানতাম লেক', তার ওপর তৈরি হয় সুদৃশ্য 'হ্যাঙ্গিং ব্রিজ '। আজ এক অন্যতম 'শুটিং লোকেশন' হয়ে উঠেছে এই মানতাম লেক। নদীবক্ষে অগুন্তি ছবি তুলে চললাম মোনাস্ট্রি দেখে নিতে। পড়ন্ত বিকেলে ফিরে লাঞ্চ সেরে নিলাম। আজ হোমস্টের লোকজন খুব ব্যাস্ত। আগামীকাল মোনাস্ট্রি তে বড়ো পূজার আয়োজন আছে, তাই গ্রামের প্রতিটি পরিবার নিজ নিজ উপায়ে প্রসাদ তৈরিতে ব্যাস্ত।
এবারের ত্রিপে 'টিংবং' এ থাকার ইচ্ছে থাকলেও সম্ভব হয়ে ওঠে নি। পরেরদিন সকালের খাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম পরের গন্তব্যে। মনের মনিকোঠায় সযত্নে নিয়ে গেলাম কিছু না ভোলা স্মৃতি আর ফেলে এলাম আবার ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি।
Comments
Post a Comment