| চটকপুর |
যাইহোক, যে কথাটা বলছিলাম; NJP বা শিলিগুড়ি থেকে যখন দার্জিলিং ই যাবেন, তখন মাঝপথে একটা রাত থেকেই যেতে পারেন চটকপুর এ | `চটকপুর´ নামটা আজ খুব একটা অচেনা নয় | 'সোনাদা' হয়ে দার্জিলিং যাওয়ার সময় ডানদিকে বেঁকে গেলে চড়াইপথে আরও 7 কিমি দূরে চটকপুর গ্রাম | যারা কালিম্পঙ বা তিনচুলে কিংবা লামাহাট্টা ঘুরে এখানে আসতে চান তাঁদের 'তিন মাইল ' থেকে বামদিকে বেঁকে গেলেই হবে | আমরা অবশ্য আমাদের সফরের শেষদিনে দার্জিলিং থেকে নামার সময় এক রাত চটকপুর এ কাটিয়ে ছিলাম|
সোনাদা থেকে বেশ চড়াই রাস্তাটা কিছুক্ষন পরে হারিয়ে যায় এক গভীর জঙ্গলে | যদি মনে করেন পাখিদের গান কে আবহসংগীত করে এই 'সেঞ্চল' ফরেস্ট এর নির্জনতা উপভোগ করবেন তবে বেমানান গাড়ি নামক যন্ত্রটা থামিয়ে নেমে পড়ুন | আমাদের গাড়িটা অবশ্য থামলো একটা চেকপোস্ট এর সামনে | গাড়িটা থামাতেই গভীর জঙ্গলের নিঃসঙ্গতা প্রথমবার জানান দিয়ে গেলো | `Senchal Wildlife Sanctuary' তে প্রবেশধিকার মূল্য মাথাপিছু 200টাকা |
প্রায় আট হাজার ফুট উচ্চতায় এই জঙ্গলের আবহে বিচ্ছিন্ন একটা গ্রামই হলো চটকপুর | গ্রামে ঢোকার ঠিক আগে 'তিন মাইলে'র দিক থেকে রাস্তাটা এসে মিসলো| জঙ্গলের ফাঁকফকোর দিয়ে চলতে চলতে যখন সেখানে পৌঁছাই, তখন দুপুর 2টো | পাহাড়ের ঠিক চূড়ায় ধাপে ধাপে ছোট ছোট রঙবেরং কাঠের ঘর নিয়ে যেনো সংসার পেতেছে এই চটকপুর, আমরা সেখানে একরাতের অতিথি | সম্প্রতি, অতিথি আপ্যায়নই গ্রামের মানুষের প্রধান জীবিকা, সাথে আছে পশুপালন আর পাহাড়ের ধাপ কেটে কিছু কিছু সব্জি ও ধান চাষ, সঙ্গে হর্টিকালচার | সর্বসাকুল্লে ষোলো টা পরিবার নিয়ে বহুযুগ স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবে সহজে সরলে কাটিয়ে দেওয়া এই ছোট্ট গ্রাম টা ট্যুরিজম এর প্রথম স্বাদ পায় 2009 এ সরকারি 'ইকো হাট' এর হাত ধরে | তারপর কখন ধীরে ধীরে চটকপুর পত্যন্ত গ্রাম থেকে হয়ে ওঠে `চটকপুর ইকো ভিলেজ´| এই প্রকৃতির মাঝে অনাড়ম্বর একটা দিন কাটাতে আপনার ভালোই লাগবে | এখানে এলে বুঝবেন, দৈনন্দিন দৌড়ঝাপ, মোবাইলের সিগন্যাল ছাড়াও দিব্বি বেঁচে থাকা যায়, অন্তত একদিন বা ধরুন দুদিন | দিব্বি সময় কেটে যায় গোটা গ্রাম টা ঘুরে দেখতে, কিংবা সবুজ গালিচা তে বসে কাঞ্চনজঙ্ঘার সাথে গপ্পো করতে | সেই সবুজ গালিচাতে ফুটে থাকা হলুদ বুনো ফুল কে ফ্রেম করে ছবি তুলতেও বেশ লাগবে | আর ভাগ্যে থাকলে রডোডেনড্রনেরো দেখা মিলতে পারে | আমরা এপ্রিল এর শুরুতে যখন ওখানে, সাদা আর লাল রডোডেনড্রন তখনো কিন্তু ঝরে যায়নি |
কাঞ্চনজঙ্ঘা অধরা থাকলেও মেঘ আর সূর্যের লুকোচুরি দেখতে দেখতে গোটা গ্রাম টা হেটে নিয়েছিলাম | পায়ে পায়ে চলতে লাগে বেশ | কিন্তু, হাঁপ ধরে, একধাপ থেকে আর একধাপ উঠতে গেলে; একটু জিরিয়ে নিয়ে আবার পরের ধাপ | এভাবে পৌঁছে গেলাম গ্রামের এক কোনে রাখা একটা `ওয়াচ টাওয়ার´এ | যাওয়ার রাস্তাটা বেশ গোছানো, কাঠের বেড়া দেওয়া, দৃষ্টিনন্দন ও বটে | নেমে আসার সময় এক্কেবারে গ্রামটার তলায় নেমে এলাম, এখানেই আছে সরকারি থাকার জায়গা 'ইকো হাট'- আমার মতে চটকপুর এ থাকার শ্রেষ্ঠ জায়গা | ফরেস্ট অফিসার এর কোনো বিশেষ বৈঠক থাকায় অবশ্যি বুক করা সম্ভব হয় নি | সামনের দোকানে গরম কফি আর মোমো খেতে খেতে জানতে পারলাম ঐ রাস্তাটাই জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে, আর এক দেড় কিমি গেলে নাকি, একটা ছোট পুকুর আর একটা বড় 'কালা পাথর ' পাওয়া যাবে, যেটাকে এরা পুন্যভরে পুজো করে থাকে | জঙ্গল গভীর, তাই একা যাওয়া বারণ | এক বয়স-আঠেরোর স্থানীয় যুবক কে পাকড়াও করে জঙ্গলে যাবো ঠিক করলাম | কালো একটা ছোট্ট পুকুরে যখন পৌঁছলাম, টিপ টিপ বৃষ্টি শুরু হলো, একটু পর থেমেও গেলো, ছাতার আর দরকার হয় নি | এই পুকুরেই নাকি 'স্যালাম্যান্ডার' রা আছে, সমস্ত প্রতিকূলটাকে জয় করে এখনো যারা বেঁচে আছে সেই জুরাসিক এজ থেকে |
এপ্রিলের এই সময় চটকপুর যে এতটা ঠান্ডা থাকবে, কল্পনা করতে পারি নি | এপ্রিলের এই সময়েই গ্রামে চলে চূড়ান্ত জলকষ্ট | হোমস্টে তে ঢোকার সময়ই তাই মালকিন সতর্ক করে দেয় অযথা জল অপচয় করার ব্যাপারে | রাত বাড়লে, অসহ্য কল্পনাতীত ঠান্ডার সাথে লড়াই করে গরম থাকার চেষ্টা, সাথে বাঁচিয়ে রেখে রেখে কষ্টার্জিত জল এর সর্বোত্তম ব্যবহার, অভিজ্ঞতার নতুন মাত্রা যোগ করে | তবে মেঘেরা আমাদের চায়ের কাপ হাতে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে দেয় নি, যেটা কিনা এইখানের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ | ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে, টাইগার হিলের প্যানোরামা, নিজের মতো করে, গুছিয়ে উপভোগ করার জন্যেই সবাই এখানে আসে বৈকি | সে আশা আমাদের পুরণ হয়নি, তবে যেটা হয়েছিল সেটা হলো, নির্লিপ্তভাবে নিভৃতে নির্জনতাকে আপন করে কয়েক ঘন্টা কাটানোর অভিজ্ঞতা | ভোর হলেই যে আবার বাগডোগরা, আবার অজস্র নোটিফিকেশনের বিপবিপ শব্দ, ফেইসবুক স্টেটাস, জীবনের না শেষ হওয়া সব টার্গেটস্ ভিড় জমাবে |
Darun lekha hoeche dada, darun obhigyota
ReplyDeleteThank you
Delete