ঘাটশিলা -অযোধ্যা -গড়পঞ্চকোট...
বহু দিন ধরে, বহু ক্রোশ দূরে
বহু ব্যায় করে বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা
দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিসের ওপর
একটি শিশির বিন্দু |
কবিগুরু বোধহয় আমাদের ইহজীবনের প্রতিটি প্রেক্ষাপট কে তাঁর কলমে ধরতে পেরেছিলেন... তাঁর কল্পনার ধানের শিসের ওপর শিশিরবিন্দুর খোঁজে তাই বেরিয়ে পড়লাম | বয়স হয়েছে অনেকটাই, পরিবারও হয়েছে, বাচ্ছাকাচ্ছা নিয়ে স্কুলের বন্ধুরা মিলে ঠিক করলাম কাছাকাছি একটা roadtrip করা যাক | ঠিক হলো আমি, শুভঙ্কর, শুভদীপ আমরা বাইক নেবো আর বাকিরা যাবে চার চাকায় |আমাদের যাত্রা কোলাঘাট থেকে| গাড়ির ট্যাংক ফুল করে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম | প্রথম দিন যাবো ঘাটশিলা |
সেপ্টেম্বর মাস, 2019| এবছর বর্ষা দীর্ঘ ইনিংস খেলে চলেছে, Biketrip এ সব weather এর সাথে মানিয়ে নিতে হয়, ওখানে অভিযোগ চলে না | খড়্গপুরের পর রাস্তা খারাপ পাবো শুনেছিলাম, রাস্তার কাজ চলছে সেখানে |কিন্তু জল, কাদা, পিচ, মোরাম মিশিয়ে এমন এক বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার হবে, হয়তো আন্দাজ করিনি|লোধাশুলিতে একটা ধাবা পেয়ে ব্রেকফাস্ট করতে দাঁড়ালাম|গরম গরম ঘুগনি মুড়ি আর চা সহযোগে ব্রেকফাস্ট করতে করতে জেনে নিলাম 15কিমি র পর রাস্তা আবার ভালো পাবো | হলোও তাই, কিছু পরে যখন ঝাড়খণ্ডে প্রবেশ করলাম, কংক্রিটের মসৃন রাস্তা আমাদের আহ্বান জানালো|বৃষ্টি ও একটু কমেছে |bike এর সত্তা যখন biker এর soul এর সাথে একাত্ম হয়, তখন যে উন্মাদনার স্মৃষ্টি হয়, সেই orgasm এর সামনে নিজেকে সমর্পন করা ছাড়া আর উপায় থাকে না | তখন শুধু আমি, রাস্তা আর অপরিসীম ভালোলাগা |
ঘাটশিলা পৌঁছে হোটেল চেক ইন করতে বেলা হয়ে গেলো, তখন আমাদের ঝোড়ো কাক এর দশা| বাকিদিনের প্ল্যান ভেস্তেই গেছিলো, কিন্তু বিকেলের দিকে আবহাওয়ার উন্নতি হলো |ঠিক করলাম এই অল্প সময়ে 'বুরুডি ড্যাম ' তা দেখে আসবো | পড়ন্ত বিকেলে, লোকজন বেশ কম, জায়গাটা বেশ ভালো, বেশ কিছু সবুজ টিলা পাহাড় ঘেরা শান্ত জলাশয়, কিছু অজানা পাখির ডাক আর দূরের জঙ্গল থেকে ঝিঁঝির ডাক সেই নির্জনতাকে আরও যেন প্রকট করে |সন্ধে নেমে আসে, গুটিকয়েক দোকান প্রায় ঝাঁপ ফেলে দিচ্ছিলো, অনুরোধ করায় চা আর ওমলেট বানিয়ে দিলো অবশ্য | হোটেলে ফিরতে রাত হয়ে যায়, সুবর্ণরেখার ধারে ' রাতমোহনা 'য় আড্ডা দেওয়ার পরিকল্পনা টা সরিয়ে রেখে মনোনিবেশ করলাম জুতো, জামাকাপড় শোকানোতে, hairdryer এর উপযোগিতা এসবক্ষেত্রে অনস্যিকার্য |
পরের দিন সূর্যদেবতা বেশ প্রসন্ন দেখলাম, আজকের গন্তব্য 'অযোধ্যা পাহাড় '| মাঝেসাঝে বাজার এলাকা বাদ দিলে এদিকের রাস্তা বেশ শুনসান | সেই রাস্তা কখনো ঝাড়খন্ড, কখনো পশ্চিমবঙ্গ হয়ে এগিয়ে চলে, বলতে বাধ্য হচ্ছি, ঝাড়খণ্ডী রাস্তা অনেক well maintained|তাই কখন কোন রাজ্যে আছি বুঝতে অসুবিধা হয়নি ! অযোধ্যা পাহাড় সংলগ্ন 'মুরুগুমা 'তে থাকবো আমরা|Google-মাসি roadtrip এ আপনাকে বিভ্রান্ত করবে না, তা আবার হয় নাকি? শর্টকাট রাস্তা নেওয়ার চক্করে পৌঁছে গেলাম অন্য এক জায়গায়|5km এর রাস্তা, ঘুরে যেতে হলো 30km| মুরুগামাতে আমাদের হোটেল 'বন পলাশী ইকো হাট ' এ পৌঁছে লাঞ্চ করতে বিকেল 4তে বেজে যায় | দেশি মুরগির ঝোল, পোস্ত বাটা দিয়ে ঘরোয়া রান্না আজও মুখে লেগে আছে | সন্ধে বেলা ' bamboo chicken ' আর কাবাব সহযোগে আড্ডা ভোলার নয় | স্থানীয় আদিবাসী রাই এইসব resort এর চালিকাশক্তি|আধুনিকতা আর যান্ত্রিকতায় শ্বাসরুদ্ধ আপনাকে, এদের অনাড়ম্বর, ঘরোয়া আতিথেয়তা কাছে টানবে | শান্ত নির্জন রাত আর আকাশ ভরা তারাদের দুচোখ ভরে দেখতেই তো আপনার এখানে আসা |
পরের দিন খুব ভোরে বেরিয়ে পড়লাম অযোধ্যা পাহাড়ের চড়াই রাস্তা ধরে| 'হেসাডি', 'বাঁধডি','কুসুমটিকবি','তেলিয়াভাসা' গ্রাম গুলি পেরিয়ে উঠে গেলাম| অল্প নিয়েই এদের বেঁচে থাকা, অল্প নিয়েই এরা সুখী| Upper Dam, Lower dam,মার্বেল লেক, পাখি পাহাড় দেখে ফিরতে ফিরতে সকাল 11টা | ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়েছিলাম অযোধ্যার হিল টপেই|জিনিসপত্র গুছিয়ে বেরোতে বেরোতে আরও এক ঘন্টা |আজকে গড় পঞ্চকোট যেতে হবে |
দেরি হয়ে যাওয়ায় বিখ্যাত 'জয়চন্ডী পাহাড়' আর দেখা হয়নি, এদিকের রাস্তা অসাধারণ|অনতিদূরের ছোট্ট ছোট্ট পাহাড় গুলো কে সঙ্গী করে আর বর্ষার সবুজ পুরুলিয়া কে বুকে ধরে এগিয়ে চলাটা, এই যাত্রার USP, গন্তব্য সেখানে গুরুত্বহীন| গড়পঞ্চকোট এ প্রায় কিছুই দেখা হয়নি, পাঞ্চেত ড্যাম টাও যাওয়া হয়নি, পরের দিন ইমার্জেন্সি কারণে ফিরতে হয়েছিল আমাদের |
যাইহোক, সেই না দেখা -র তাড়নায় হয়তো আবার ফিরে আসবো | হয়তো আবার একসময় পলাশের টানে আসবো ফিরে, সবুজ পুরুলিয়া যখন সাজবে লাল পলাশের চাদরে| ফিরতে ফিরতে এই ভেবে চলেছি আর কবিগুরুর পংতিগুলো মনে বেজে চলেছে অনবরত |
বহু দিন ধরে, বহু ক্রোশ দূরে
বহু ব্যায় করে বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা
দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিসের ওপর
একটি শিশির বিন্দু |
কবিগুরু বোধহয় আমাদের ইহজীবনের প্রতিটি প্রেক্ষাপট কে তাঁর কলমে ধরতে পেরেছিলেন... তাঁর কল্পনার ধানের শিসের ওপর শিশিরবিন্দুর খোঁজে তাই বেরিয়ে পড়লাম | বয়স হয়েছে অনেকটাই, পরিবারও হয়েছে, বাচ্ছাকাচ্ছা নিয়ে স্কুলের বন্ধুরা মিলে ঠিক করলাম কাছাকাছি একটা roadtrip করা যাক | ঠিক হলো আমি, শুভঙ্কর, শুভদীপ আমরা বাইক নেবো আর বাকিরা যাবে চার চাকায় |আমাদের যাত্রা কোলাঘাট থেকে| গাড়ির ট্যাংক ফুল করে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম | প্রথম দিন যাবো ঘাটশিলা |
সেপ্টেম্বর মাস, 2019| এবছর বর্ষা দীর্ঘ ইনিংস খেলে চলেছে, Biketrip এ সব weather এর সাথে মানিয়ে নিতে হয়, ওখানে অভিযোগ চলে না | খড়্গপুরের পর রাস্তা খারাপ পাবো শুনেছিলাম, রাস্তার কাজ চলছে সেখানে |কিন্তু জল, কাদা, পিচ, মোরাম মিশিয়ে এমন এক বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার হবে, হয়তো আন্দাজ করিনি|লোধাশুলিতে একটা ধাবা পেয়ে ব্রেকফাস্ট করতে দাঁড়ালাম|গরম গরম ঘুগনি মুড়ি আর চা সহযোগে ব্রেকফাস্ট করতে করতে জেনে নিলাম 15কিমি র পর রাস্তা আবার ভালো পাবো | হলোও তাই, কিছু পরে যখন ঝাড়খণ্ডে প্রবেশ করলাম, কংক্রিটের মসৃন রাস্তা আমাদের আহ্বান জানালো|বৃষ্টি ও একটু কমেছে |bike এর সত্তা যখন biker এর soul এর সাথে একাত্ম হয়, তখন যে উন্মাদনার স্মৃষ্টি হয়, সেই orgasm এর সামনে নিজেকে সমর্পন করা ছাড়া আর উপায় থাকে না | তখন শুধু আমি, রাস্তা আর অপরিসীম ভালোলাগা |
ঘাটশিলা পৌঁছে হোটেল চেক ইন করতে বেলা হয়ে গেলো, তখন আমাদের ঝোড়ো কাক এর দশা| বাকিদিনের প্ল্যান ভেস্তেই গেছিলো, কিন্তু বিকেলের দিকে আবহাওয়ার উন্নতি হলো |ঠিক করলাম এই অল্প সময়ে 'বুরুডি ড্যাম ' তা দেখে আসবো | পড়ন্ত বিকেলে, লোকজন বেশ কম, জায়গাটা বেশ ভালো, বেশ কিছু সবুজ টিলা পাহাড় ঘেরা শান্ত জলাশয়, কিছু অজানা পাখির ডাক আর দূরের জঙ্গল থেকে ঝিঁঝির ডাক সেই নির্জনতাকে আরও যেন প্রকট করে |সন্ধে নেমে আসে, গুটিকয়েক দোকান প্রায় ঝাঁপ ফেলে দিচ্ছিলো, অনুরোধ করায় চা আর ওমলেট বানিয়ে দিলো অবশ্য | হোটেলে ফিরতে রাত হয়ে যায়, সুবর্ণরেখার ধারে ' রাতমোহনা 'য় আড্ডা দেওয়ার পরিকল্পনা টা সরিয়ে রেখে মনোনিবেশ করলাম জুতো, জামাকাপড় শোকানোতে, hairdryer এর উপযোগিতা এসবক্ষেত্রে অনস্যিকার্য |
পরের দিন সূর্যদেবতা বেশ প্রসন্ন দেখলাম, আজকের গন্তব্য 'অযোধ্যা পাহাড় '| মাঝেসাঝে বাজার এলাকা বাদ দিলে এদিকের রাস্তা বেশ শুনসান | সেই রাস্তা কখনো ঝাড়খন্ড, কখনো পশ্চিমবঙ্গ হয়ে এগিয়ে চলে, বলতে বাধ্য হচ্ছি, ঝাড়খণ্ডী রাস্তা অনেক well maintained|তাই কখন কোন রাজ্যে আছি বুঝতে অসুবিধা হয়নি ! অযোধ্যা পাহাড় সংলগ্ন 'মুরুগুমা 'তে থাকবো আমরা|Google-মাসি roadtrip এ আপনাকে বিভ্রান্ত করবে না, তা আবার হয় নাকি? শর্টকাট রাস্তা নেওয়ার চক্করে পৌঁছে গেলাম অন্য এক জায়গায়|5km এর রাস্তা, ঘুরে যেতে হলো 30km| মুরুগামাতে আমাদের হোটেল 'বন পলাশী ইকো হাট ' এ পৌঁছে লাঞ্চ করতে বিকেল 4তে বেজে যায় | দেশি মুরগির ঝোল, পোস্ত বাটা দিয়ে ঘরোয়া রান্না আজও মুখে লেগে আছে | সন্ধে বেলা ' bamboo chicken ' আর কাবাব সহযোগে আড্ডা ভোলার নয় | স্থানীয় আদিবাসী রাই এইসব resort এর চালিকাশক্তি|আধুনিকতা আর যান্ত্রিকতায় শ্বাসরুদ্ধ আপনাকে, এদের অনাড়ম্বর, ঘরোয়া আতিথেয়তা কাছে টানবে | শান্ত নির্জন রাত আর আকাশ ভরা তারাদের দুচোখ ভরে দেখতেই তো আপনার এখানে আসা |
পরের দিন খুব ভোরে বেরিয়ে পড়লাম অযোধ্যা পাহাড়ের চড়াই রাস্তা ধরে| 'হেসাডি', 'বাঁধডি','কুসুমটিকবি','তেলিয়াভাসা' গ্রাম গুলি পেরিয়ে উঠে গেলাম| অল্প নিয়েই এদের বেঁচে থাকা, অল্প নিয়েই এরা সুখী| Upper Dam, Lower dam,মার্বেল লেক, পাখি পাহাড় দেখে ফিরতে ফিরতে সকাল 11টা | ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়েছিলাম অযোধ্যার হিল টপেই|জিনিসপত্র গুছিয়ে বেরোতে বেরোতে আরও এক ঘন্টা |আজকে গড় পঞ্চকোট যেতে হবে |
দেরি হয়ে যাওয়ায় বিখ্যাত 'জয়চন্ডী পাহাড়' আর দেখা হয়নি, এদিকের রাস্তা অসাধারণ|অনতিদূরের ছোট্ট ছোট্ট পাহাড় গুলো কে সঙ্গী করে আর বর্ষার সবুজ পুরুলিয়া কে বুকে ধরে এগিয়ে চলাটা, এই যাত্রার USP, গন্তব্য সেখানে গুরুত্বহীন| গড়পঞ্চকোট এ প্রায় কিছুই দেখা হয়নি, পাঞ্চেত ড্যাম টাও যাওয়া হয়নি, পরের দিন ইমার্জেন্সি কারণে ফিরতে হয়েছিল আমাদের |
যাইহোক, সেই না দেখা -র তাড়নায় হয়তো আবার ফিরে আসবো | হয়তো আবার একসময় পলাশের টানে আসবো ফিরে, সবুজ পুরুলিয়া যখন সাজবে লাল পলাশের চাদরে| ফিরতে ফিরতে এই ভেবে চলেছি আর কবিগুরুর পংতিগুলো মনে বেজে চলেছে অনবরত |
Comments
Post a Comment